বিশুদ্ধ পানির সংকটে হাজারো মানুষ, ক্ষোভে স্থানীয়রা

প্রকাশক: Dainik Jagroto Matrivumi JM Television
প্রকাশ: 3 hours ago

আল-আমিন হোসেন, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ৪ নম্বর দৌলতপুর ইউনিয়নের মতি মার্কেট এলাকায় অবস্থিত একটি প্রসেস মিলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র পরিবেশ দূষণ, ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ ও চরম জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের জোরালো দাবি, মিলটির মালিক দৌলতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে পরিচিত হাজী আব্দুস সাত্তার (ছত্তর হাজী)। তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম পরিবেশগত নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে এই মিলটি পরিচালনা করে আসছেন।স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, মিলটির কোনো আধুনিক বা কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (ETP) না থাকায় উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যবহৃত রাসায়নিক মিশ্রিত বিষাক্ত পানি আশপাশের পুকুর, ডোবা ও উম্মুক্ত জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পুকুরেও জোরপূর্বক এই দূষিত পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে। এর প্রতিবাদ করতে গেলে মালিকপক্ষের লোকজনের দ্বারা ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি করেন অনেকে।এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, প্রসেস মিল থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক পানি ও কালো ধোঁয়ার কারণে পুরো এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আশপাশের টিউবওয়েলগুলোর পানি সম্পূর্ণ পানের অযোগ্য ও বিষাক্ত হয়ে পড়েছে।

ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় ৫০০ মিটার দূর থেকে খাবার ও রান্নার জন্য বিশুদ্ধ পানি মাথায় করে সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক হাজার পরিবারের বসবাস এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই তীব্র দূষণে ভুগলেও নিরাপত্তার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে মতি মার্কেট এলাকার ‘দৌলতপুর মতি মার্কেট তাজবিদুল কোরআন নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা’। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১৫০ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিশুদ্ধ খাবার পানি ও নিত্যদিনের গোসলের পানির সংকটে শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে।মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক জুবায়ের হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রসেস মিলের কারণে আশপাশের পরিবেশ ও বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা একটু বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে না। অনেক সময় টিউবওয়েলের দুর্গন্ধযুক্ত পানি ব্যবহার করতেও আমাদের ভয় লাগে। শিক্ষার্থীদের গোসল ও খাবার পানির জন্য দূর-দূরান্ত থেকে পানি আনতে হয়, যা তাদের চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে। আমরা বারবার বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।”এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, প্রসেস মিলের জমে থাকা কেমিক্যালযুক্ত দূষিত পানির কারণে এলাকায় মশার উপদ্রব মহামারি আকার ধারণ করেছে। সন্ধ্যার পর মশার কামড়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মারাত্মক রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে।মিলের পাশেই অবস্থিত দৌলতপুর মতি মার্কেট বাজারের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের দাবি, মিল থেকে নির্গত তীব্র দুর্গন্ধের কারণে বাজারের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কেমিক্যালযুক্ত পানি ও দুর্গন্ধের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিষাক্ত পানি ছড়িয়ে রয়েছে। বর্ষা এলে এই দূষিত পানি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয়ে পড়ে, যার ফলে আরও বৃহৎ জনপদ স্থায়ী পরিবেশগত ধ্বংসের মুখে পড়বে।অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে মিলটি বন্ধ অথবা অন্যত্র স্থানান্তরের বিষয়ে একাধিকবার মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময়ে সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সংখ্যালঘু হিন্দু বাসিন্দা জানান, তারা এ বিষয়ে ইতিপূর্বে প্রতিবাদ করতে গেলে বিভিন্নভাবে সামাজিক চাপ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।এ বিষয়ে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আজিজুল হক পলাশ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা ভোট চাইতে এলাকায় গেলে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এই প্রসেস মিলের কারণে তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও তীব্র ভোগান্তির কথা জানান। তখন আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এখন আমি উপজেলা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, অতি দ্রুত এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

অন্যথায় ভুক্তভোগী সাধারণ এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তীব্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে এর সমাধান করা হবে।”প্রসেস মিলের এই দূষণ ও ভয়াবহ জনভোগান্তির বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিভিন্ন সময়ে ভুক্তভোগীরা লিখিত আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।তবে এ বিষয়ে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান বলেন, “এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমার দপ্তরে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ আসেনি। সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”এলাকার সচেতন মহল, পরিবেশবাদী সংগঠন ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি এলাকাবাসীর জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।উক্ত গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত প্রসেস মিলের মালিক হাজী আব্দুস সাত্তারের বক্তব্য জানার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।

  • দৌলতপুর ইউনিয়ন
  • প্রসেস মিলের দূষণ
  • বিশুদ্ধ পানির সংকট
  • বেলকুচি উপজেলা
  • মতি মার্কেট
  • সিরাজগঞ্জ সংবাদ
  • হাজী আব্দুস সাত্তার