
আল-আমিন হোসেন, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য (ইউপি মেম্বার) সোহেল মোল্লা (৪০) এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী নুরুল ইসলাম, তোফাজ্জল ও আল-আমিন মালের বিরুদ্ধে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, হামলা, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন গোপরেখী ও আশপাশ এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধির পরিচয় ও পদবি ব্যবহার করে সোহেল মোল্লা এলাকায় এক ধরনের একক আধিপত্য ও ত্রাসের রাজত্ব বিস্তার করেছেন। তাঁর এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে নানাবিধ হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক হামলার শিকার হতে হয় বলেও দাবি করেন একাধিক ব্যক্তি। বিশেষ করে সম্প্রতি গোপালপুর বটতলা এলাকার একটি স্লুইসগেট খুলে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় মৎস্যচাষীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষীরা জানান, রোববার দুপুরে বটতলা গরুরহাটের ইজারা নেওয়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন যে, উক্ত ঘটনায় ইউপি সদস্য সোহেল মোল্লা মারধরের শিকার হয়েছেন—যদিও ঘটনার প্রকৃত বিবরণ নিয়ে তারা নিশ্চিত নন। মৎস্যচাষীদের অভিযোগ, এই ঘটনারই জেরে রোববার গভীর রাতে প্রবল বৃষ্টিপাতের সুযোগ নিয়ে গোপালপুর বটতলার স্লুইসগেটটি পরিকল্পিতভাবে খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে আশপাশের মাছের ঘেরগুলো মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায় এবং বিভিন্ন প্রজাতির চাষ করা মাছ বের হয়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাতের অন্ধকারে কে বা কারা স্লুইসগেট খুলে দিয়েছে আমরা সরাসরি দেখিনি। কিন্তু গেট খোলার পর হঠাৎ পানি ঢুকে পুরো ঘের তলিয়ে যায়। কয়েক মাস ধরে অনেক টাকা লগ্নি করে লালন-পালন করা সব মাছ ভেসে যাওয়ায় আমাদের প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”এছাড়াও গোপালপুর বটতলা বাজারে নিয়মিত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও চাঁদা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সম্প্রতি হাশেম আলীর দোকানের সামনে একটি সুতার গাড়ি দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে ইউপি সদস্য সোহেল মোল্লা প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি করেন। ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করি। কোনো অপরাধ না করেও জনপ্রতিনিধির ভয়ভীতির কারণে শান্তিতে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চাঁদার টাকা না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানির আশঙ্কা থাকে।”এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, সোহেল মোল্লার বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডের রেকর্ড রয়েছে। প্রায় দুই বছর আগে জমি মাপজোককে কেন্দ্র করে এক সংঘর্ষের ঘটনায় তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে স্থানীয় রিয়াজ (২২) নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর জখম অবস্থায় দীর্ঘ ছয় মাস মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে চিকিৎসার পর ওই যুবক সুস্থ হন। এছাড়াও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে মাদক কেনাবেচার অভিযোগে সোহেল মোল্লা গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানেও তিনি একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে এলাকায় মাদক ব্যবসা পর্দার আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন; যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি নথি তাৎক্ষণিকভাবে মেলেনি।সার্বিক বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য সোহেল মোল্লার বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর কোনো মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শামসুল হক এই প্রসঙ্গে বলেন, “স্লুইসগেটের চাবিটি নির্দিষ্টভাবে কার জিম্মায় আছে তা আমি নিশ্চিত নই। তবে এলাকায় সোহেল মোল্লার বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু অভিযোগ আমিও শুনেছি।
বিষয়টি নিয়ে পরিষদের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। পরিষদ থেকে বিধি মোতাবেক কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”এদিকে ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। তাঁরা দ্রুত নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
