
বিশেষ প্রতিবেদন:
আজ ২ জুন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক যৌনকর্মী দিবস (International Sex Workers’ Day)। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিবসটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে খুব একটা ধারণা নেই বললেই চলে। এ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর কারণে বিষয়টি মূলধারার আলোচনায় না এলেও, দিবসটির উৎপত্তির পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, পুলিশি হয়রানি ও মৌলিক অধিকারের দাবিতে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক আন্দোলনের দীর্ঘ গল্প।
ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ২ জুন ফ্রান্সের লিয়ন শহরের সেন্ট-নিজিয়ার গির্জায় (Saint-Nizier Church) শতাধিক যৌনকর্মী একত্রিত হয়ে একটি অভূতপূর্ব অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। তাদের প্রধান অভিযোগ ছিল—তৎকালীন সময়ে একদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত পুলিশি হয়রানি ও আইনি জরিমানা বাড়ানো হচ্ছিল, অন্যদিকে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কোনো যথাযথ তদন্ত করছিল না পুলিশ। ফলশ্রুতিতে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে তারা এই ভিন্নধর্মী প্রতিবাদে নামেন।
সেই সময় আন্দোলনকারীরা গির্জার চূড়ায় একটি আবেগঘন ব্যানার টাঙিয়ে লিখেছিলেন, “আমাদের সন্তানরা তাদের মায়েদের জেলে দেখতে চায় না।” নিজেদের অধিকার আদায়ের এই ব্যতিক্রমী আন্দোলনটি মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই গোটা ইউরোপের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তীব্র নজর কাড়ে এবং দ্রুতই ফ্রান্সের অন্যান্য বড় বড় শহরেও ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও তাৎক্ষণিকভাবে সেই সময় তাদের সব আইনি দাবি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, তবে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটিকেই ইউরোপের বুকে যৌনকর্মীদের অধিকার ও মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তীতে সেই সাহসী আন্দোলনের স্মরণে ১৯৭৬ সাল থেকে প্রতি বছর ২ জুন বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক যৌনকর্মী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশেষ দিবসের মূল উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট পেশাকে সামাজিকভাবে উৎসাহিত বা প্রোমোট করা নয়; বরং সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মৌলিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং তাদের প্রতি সমাজের অন্ধ বৈষম্যবিরোধী সচেতনতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে একটি মানবিক আলোচনা সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের কারণে দিবসটি নিয়ে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি দেখা না গেলেও, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় মানবাধিকার সংগঠন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO) ও অধিকারকর্মীরা দিনটি উপলক্ষে সেমিনার, সচেতনতামূলক র্যালি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষামূলক বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকেন।
