আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ ছাড়তে নারাজ শেখ হাসিনা

প্রকাশক: Dainik Jagroto Matrivumi JM Television
প্রকাশ: 5 hours ago

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারানোর পর দীর্ঘ দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো কার্যকর কৌশল খুঁজে পাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। দলের শীর্ষ পর্যায়, বিশেষ করে শেখ হাসিনা নিজের অবস্থানে অনড় থাকায় দলটিকে ‘পরিশুদ্ধ’ করার যে আলোচনা উঠেছিল, তা এখন সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ভোগ করা ক্ষমতার প্রভাব ও মাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতারা এখন এক চরম অনিশ্চিত ‘অপেক্ষার রাজনীতি’ করে দিন পার করছেন।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই দলটির বিভিন্ন বন্ধুপ্রতিম দেশ ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাদের মূল তাগিদ ছিল—বিতর্কিত ব্যক্তিদের সরিয়ে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের সামনে এনে দলে বড় ধরনের সংস্কার করা। তবে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা নিজের পদ থেকে সরতে একেবারেই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বড়জোর সাধারণ সম্পাদক পদের বিকল্প হিসেবে বিদেশে অবস্থানরত নিজের পছন্দের কিছু নেতাকে দলের নতুন মুখ বা মুখপাত্র করার আভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ফর্মুলা সংস্কারপন্থী ও হিতৈষীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। ফলে দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত পরিবর্তনের যাবতীয় পথ আপাতত রুদ্ধ হয়ে গেছে।বর্তমান বৈরী পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের কর্মী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি বড় অংশের মধ্যে চরম হতাশা ভর করেছে। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকা এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে বেশিরভাগ নেতাকর্মী এখন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। বিশেষ করে যেসব সাবেক সংসদ সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতার বড় ধরনের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে, তারা নিজেদের বাঁচাতে রাজনীতি থেকে পাকাপাকিভাবে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আইনি সুরক্ষায় জামিন পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলে অনেকেই দেশে ফেরার কথা ভাবতেন, তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে, ৫ আগস্টের পর ভারত, ইউরোপ ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেওয়া দলটির পলাতক নেতাদের অনেকেই এখন তীব্র আর্থিক অনটনে ভুগছেন বলে জানা গেছে। তদুপরি, ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভালো হওয়ার স্পষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ভারত ছেড়ে মালয়েশিয়া বা সাইপ্রাসের মতো অন্য দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন।দলের ভেতরে এখন মূলত কট্টরপন্থী নেতারাই গোপনে ও প্রকাশ্যে সবচেয়ে বেশি তৎপর। তারা শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প মানতে রাজি নন এবং বিগত দীর্ঘ শাসনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বা অপরাধের জন্য কোনো ধরনের দুঃখ প্রকাশ কিংবা আত্মোপলব্ধির পথে হাঁটছেন না। তাদের ধারণা, বর্তমান প্রশাসন যদি কোনো বড় ধরনের ভুল করে কিংবা জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তবে সেই সুযোগে তারা আবার মাঠে নামতে পারবেন। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে চলে আসা ‘পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ গড়ার আলোচনাটি এখন পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। কট্টরপন্থীদের মতে, দল যদি কখনো আবার রাজনীতি করার আইনি সুযোগ পায়, তখন সংস্কারের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান বলয়ের ভেতরেই হতে হবে।বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ এ প্রসঙ্গে মনে করেন, যেকোনো উপায়ে গায়ের জোরে রাজনীতিতে ফেরার চিন্তা আওয়ামী লীগের জন্য নতুন করে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ ছিল বিগত ১৫ বছরের শাসন আমলের ভুলত্রুটি ও অপরাধের জন্য জনগণের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং জবাবদিহি করা। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আওয়ামী লীগ যদি কোনো ধরনের অনুশোচনা ছাড়া গায়ের জোরে মাঠে নামার চেষ্টা করে, তবে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সম্মিলিতভাবে তাদের রাজপথে প্রতিহত করবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জন্য আরও একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, দলটির কার্যক্রম আইনিভাবে নিষিদ্ধ করার চেয়ে তাদের রাজনৈতিকভাবে সরাসরি জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোটা বেশি কার্যকর হতো। কারণ, এখন নিষেধাজ্ঞা থাকার সুযোগ নিয়ে দলটি বিশ্ব দরবারে নিজেদের ‘ভিকটিম’ বা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে প্রচার করার একটি বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।বর্তমানে দলটির এই ছন্নছাড়া সাংগঠনিক অবস্থা টিকিয়ে রাখতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশে ও দেশের বাইরে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের কোনোমতে সুসংগঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

পাশাপাশি, ভারতের কলকাতার একটি বিশেষ গ্রুপ বর্তমান সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এছাড়া একটি অংশ ইন্টারনেটের মাধ্যমে দলীয় প্রধানের সঙ্গে নিয়মিত ভার্চুয়াল বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান, সাংগঠনিক মজবুতি ও মাঠের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

  • আওয়ামী লীগ সংবাদ
  • জাহাঙ্গীর কবির নানক
  • শেখ হাসিনা