
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৫ (নবীনগর) আসনে রাজনৈতিক তৎপরতা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে এ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন তিনজন প্রার্থী। স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের মনে প্রশ্ন—এই তিনজনের মধ্যে কে নবীনগরের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ও কল্যাণকর প্রতিনিধি হতে পারবেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মুফতি আমজাদ হুসাইন আশরাফীর নামটি আলাদা করে সামনে আসে।
মুফতি আমজাদ হুসাইন আশরাফী কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের একজন সফল চেয়ারম্যান ছিলেন। চার বছর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রমাণ করেছেন—জনপ্রতিনিধি মানে ক্ষমতার আসনে বসে থাকা নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর কাছে কখনো বৈষম্য ছিল না। নবীনগরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নির্ভয়ে তাঁর কাছে গিয়ে নিজেদের কষ্ট, দাবি ও সমস্যার কথা বলতে পেরেছেন—যা স্থানীয় রাজনীতিতে একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
রাজনীতির বাস্তবতায় উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে—ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এলাকা উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়। যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় যায় অথচ এ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচিত হন, কিংবা বিএনপি জোট ক্ষমতায় গিয়ে নবীনগর থেকে স্বতন্ত্র বা ভিন্ন জোটের প্রার্থী নির্বাচিত হন—তাহলে উন্নয়ন বরাদ্দে নবীনগর বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। কিন্তু মুফতি আমজাদ হুসাইন আশরাফী নির্বাচিত হলে এই আশঙ্কা কম। কারণ তিনি দলীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; তিনি সব সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে জানেন।
এর বাস্তব প্রমাণ তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালেই দিয়েছেন। তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে দুইজন সংসদ সদস্য পরিবর্তন হলেও উভয়ের সঙ্গেই সমন্বয় করে তিনি এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দ এনেছেন। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, যখন এলাকায় সংসদ সদস্য শূন্যতা ছিল, তখনও তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিবদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নবীনগরের স্বার্থ তুলে ধরেছেন।স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সংকটে পড়ার সময় তাঁর নেতৃত্ব আরও স্পষ্ট হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সারা দেশে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড সদস্যদের কার্যক্রম স্থগিত হলে, তিনি দেশের সব চেয়ারম্যানকে সংগঠিত করেন। আন্দোলন ও আলোচনার মাধ্যমে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বসে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এটি তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।মুফতি আমজাদ হুসাইন আশরাফীর আরেকটি বড় শক্তি হলো তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা। তিনি ধর্মীয় ও জাগতিক—উভয় শিক্ষায়ই সর্বোচ্চ শিক্ষিত। ইসলামি আইন বিষয়ে তাঁর রয়েছে উচ্চতর ডিগ্রি, পাশাপাশি তিনি ডাবল এমএ সম্পন্ন করেছেন। এই দ্বৈত শিক্ষাগত ভিত্তি তাঁকে ভারসাম্যপূর্ণ, চিন্তাশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বে পরিণত করেছে। তাঁর নেতৃত্বে নবীনগরে ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে কোনো বিভাজন নয়, বরং সমন্বিত উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়।দেশের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি হলো ইমাম ও মুয়াজ্জিন সমাজ। মুফতি আমজাদ হুসাইন আশরাফী নিজেও একজন ইমাম হওয়ায় এই জনগোষ্ঠীর দুঃখ, বঞ্চনা ও সংগ্রামের বাস্তবতা তিনি খুব কাছ থেকে জানেন। তাই ইমাম-মুয়াজ্জিনদের অধিকার, সম্মান ও জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি তাঁর কাছে কেবল নির্বাচনী বক্তব্য নয়; এটি তাঁর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার জায়গা।
তিনি একজন ওয়ায়েজ ও জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা হিসেবেও সারা দেশে সুপরিচিত। এই জাতীয় পরিচিতির কারণে তিনি সংসদে গেলে শুধু নবীনগরের প্রতিনিধি হিসেবেই নয়, বরং সারা বাংলাদেশের ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হয়ে কথা বলার সক্ষমতা রাখেন—যা এই আসনের অন্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ততটা দৃশ্যমান নয়।
নবীনগরের মানুষ আরেকটি বিষয় থেকেও মুক্তি চায়—নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। মামলা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগে সাধারণ মানুষ যেন আর হয়রানির শিকার না হয়। বিশেষ করে বিগত দেড় বছরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অনেক নির্দোষ মানুষ যে হয়রানির শিকার হয়েছেন, সেই অধ্যায়ের অবসান চান এলাকাবাসী। মুফতি আমজাদ হুসাইন আশরাফী প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন—এই বিশ্বাস তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড থেকেই মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নবীনগর উপজেলা সভাপতি হিসেবে তাঁর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, একজন সফল চেয়ারম্যান হিসেবে প্রশাসনিক দক্ষতা, একজন আলেম ও বক্তা হিসেবে জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা—সব মিলিয়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের তিনজন প্রার্থীর ভিড়ে তিনি আলাদা হয়ে উঠেছেন।শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটাররাই। তবে অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক ভারসাম্য ও মানবিক নেতৃত্ব—এই সূচকে বিচার করলে বলা যায়, মুফতি আমজাদ হুসাইন আশরাফী নবীনগরের জন্য অন্য সব প্রার্থীর তুলনায় অধিক কল্যাণকর একটি বিকল্প।লেখক : হাফেজ মাওলানা নুরে আলম জাহাঙ্গীর, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক।
