জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ঠাকুরগাঁওয়ের নারীদের ভাবনা

প্রকাশক: Dainik Jagroto Matrivumi JM Television
প্রকাশ: 3 months ago

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এখন দেশের প্রতিটি অঞ্চলে বইছে রাজনৈতিক উত্তাপ। পোস্টার, সভা-সমাবেশে জমে উঠেছে মাঠ। তবে এই উত্তাপের মাঝেও দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী, নারী সমাজ—ভাবছেন ভিন্নভাবে। তারা শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নিয়ে ভাবছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের নারীদের চোখে নির্বাচনের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাবও তাই অনেক। ঠাকুরগাঁও শহর, উপজেলা সদর ও গ্রামীণ জনপদ ঘুরে দেখা গেছে, নারী ভোটারদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে তিনটি বিষয়— নিরাপত্তা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান। তাদের মতে, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী আরমিন আক্তার বলেন, আমরা চাই এমন সরকার, যারা শুধু উন্নয়ন নয়, নারীদের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কারণ এখনও অনেক পরিবার মেয়েদের উচ্চশিক্ষা দিতে ভয় পায়।গৃহিণী রোকসানা বেগম বলেন, জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়েনি। তাই আমরা এমন নেতা চাই, যিনি নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্র তৈরি করবেন।তাদের মতে, নারীরা যেন সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারেন, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করাই হবে প্রকৃত উন্নয়ন। এছাড়া রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগ বাড়াতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।ঠাকুরগাঁও শহরের কর্মজীবী নারী হুমাইরা আক্তার লিজা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা চাই – এমন নেতৃত্ব আসুক যারা সত্যিকার অর্থে জনগণের পাশে থাকবে এবং সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করবে। তিনি আরও বলেন, ভোটের সময় অনেক নারীরা ভয় পান কেন্দ্রে যেতে। সেই ভয় দূর করতে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক জেবুন নাহার মনে করেন, নারীরা এখন আর নিছক দর্শক নন, তারা পরিবর্তনের অংশ। এক সময় ঈদের মতোই ভোটের উৎসব থাকত, কিন্তু মাঝখানে নারীদের জন্য ভোটকেন্দ্র অনুকূলে ছিল না। ফলে অনেকেই ভোটবিমুখ হয়ে পড়েন। এখন প্রয়োজন এমন পরিবেশ, যেখানে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারবেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরা সমান সুযোগ পাবেন।অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদ পারভীন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা এমন সরকার চাই, যারা বৈধভাবে নির্বাচিত হয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করবে। যেখানে কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে নারীদের এগিয়ে নেওয়া হবে। উন্নয়নের মাপকাঠি তখনই পূর্ণ হবে, যখন দেশের কাজে নারী ও পুরুষ সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন এমন অনেক তরুণী ভোটারও আছেন ঠাকুরগাঁওয়ে। তাদের মধ্যে ভোট নিয়ে আগ্রহ ও সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে। কলেজ শিক্ষার্থী প্রাপ্তি সরকার বলেন, এটা আমার জীবনের প্রথম ভোট। আমি চাই, নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকুক, যেন সবাই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারে।নতুন প্রজন্মের এসব নারী ভোটাররা বিশ্বাস করেন, তাদের একটি ভোটেই হতে পারে পরিবর্তনের সূচনা। তারা চান যে রাজনীতি হোক সহনশীল, উন্নয়ন হোক মানবিকতার ভিত্তিতে।ঠাকুরগাঁওয়ের নারীরা মনে করেন, উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বা বিল্ডিং নয়— উন্নয়ন মানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার, সমান মর্যাদা ও সমান সুযোগ। তারা চান, রাজনীতি ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে নারীদের নেতৃত্বে এগিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হোক।দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীরা আজ শুধু ভোটার নন— তারা সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত। ঠাকুরগাঁওয়ের নারীরা যে সচেতনতা ও প্রত্যাশার কথা বলছেন, সেটিই হয়ত দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিক-নির্দেশনা দেবে। তাদের এই অংশগ্রহণ, আশা ও আত্মবিশ্বাস আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নতুন এক সম্ভাবনার বার্তা বয়ে আনবে— যেখানে নারী কেবল দর্শক নয়, বরং পরিবর্তনের চালিকাশক্তি