
কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজারের উপকূলীয় নদীপথ ব্যবহার করে আবারও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা পাচারের চেষ্টা ব্যর্থ হলো। র্যাব-১৫ এর একটি বিশেষ অভিযানে বাকখালী নদীর মোহনা থেকে চার লক্ষ ষাট হাজার পিস ইয়াবাসহ নয়জনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
র্যাব সূত্র জানায়, মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট ২০২৫) বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। টেকনাফ থেকে একটি মাছ ধরার ট্রলারে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা কক্সবাজারে আনা হচ্ছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব নজরদারি শুরু করে। পরে নাজিরহাট ১ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় বাকখালী নদীর মোহনায় ট্রলারটি থামানো হয়। তল্লাশির সময় তেলের ড্রামের ভেতরে লুকানো অবস্থায় পাওয়া যায় ৪,৬০,০০০ ইয়াবা।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আব্বাস উদ্দিন, মো. আবু তাহের, মো. ফিরোজ, মো. মোস্তাক আহাম্মদ, নবী হোসেন, শাহাব উদ্দিন, সেলিম, জাফর আলম ও আবুল কালাম ওরফে কালু। তাদের প্রত্যেকেই কক্সবাজার ও আশপাশের বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। র্যাবের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা অভিনব কৌশলে মাদক পাচার করে আসছিলেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এই চালানের মূল হোতা মহেশখালীর মো. বোরহান উদ্দিন, যিনি বর্তমানে পলাতক।
মাদকবিরোধী সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, ট্রলারভিত্তিক এই ধরনের পাচার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। সমুদ্র ও নদীপথ তুলনামূলক নিরাপদ মনে করে পাচারকারীরা বরাবরই এ রুট ব্যবহার করে আসছে। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে বড় চালান ধরা পড়লেও এর মূল হোতাদের ধরতে বেশ বেগ পেতে হয়।
স্থানীয়রা মনে করেন, কক্সবাজারের মতো পর্যটননগরীতে মাদকের বিস্তার সামাজিক কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে। যুবসমাজের অনেকেই এই ইয়াবার সহজলভ্যতায় আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা পরিবার ও সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি। এক স্থানীয় সমাজকর্মী বলেন, “মাদক শুধু ব্যক্তিকে ধ্বংস করছে না, এটি অপরাধ প্রবণতা, চুরি, ছিনতাই ও পারিবারিক সহিংসতা বাড়াচ্ছে। তাই কক্সবাজারকে বাঁচাতে হলে মাদক শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে হবে।”
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মাদক ব্যবসা স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি কালো অর্থনীতি তৈরি করেছে। মাদকপাচারকারীরা অবৈধ অর্থ দিয়ে ভূমি, ব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটাচ্ছে, যা আইনের শাসন ও স্বচ্ছ অর্থনীতির জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা।
অভিযানে জব্দ করা ইয়াবার পরিমাণ এত বেশি যে এর বাজারমূল্য কয়েক শত কোটি টাকা হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এত বিপুল মাদকের চালান আটক হওয়া প্রমাণ করে, সীমান্ত ও সমুদ্রপথে এখনও বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে।
কক্সবাজারের পুলিশ প্রশাসন জানায়, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন। পাশাপাশি ট্রলারের মালিক ও মূল হোতাকে ধরতে যৌথ অভিযান চালানো হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আটক ও মামলা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। মাদক পাচারের রুট বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করতে হবে।
গত কয়েক বছরে র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি বহুবার কক্সবাজার উপকূল থেকে লাখ লাখ ইয়াবা আটক করেছে। তবুও পাচারের ধারা থামেনি। কারণ এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধাজনক। মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা এলাকা দিয়ে সহজেই ইয়াবা ঢুকে পড়ে এবং নদী ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করে তা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
অভিযানে অংশ নেওয়া র্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাই শুধু চালান আটক নয়, মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে। তাহলেই এই সমস্যার মূল সমাধান সম্ভব।”
এদিকে আটক ব্যক্তিদের পরিবার দাবি করছে, তারা নির্দোষ এবং ষড়যন্ত্রের শিকার। তবে র্যাব বলছে, যথেষ্ট প্রমাণ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করলো যে, কক্সবাজার বাংলাদেশের মাদক পাচারের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। নিয়মিত অভিযান চললেও এর পেছনের শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙা এখনও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
