

জুনায়েদ,ব্রাহ্মণবাড়িয়া:
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের মাঝেই দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী লিচুর বাজার জমে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে। গুণগত মান, চমৎকার স্বাদ এবং মনকাড়া সুগন্ধের কারণে এখানকার লিচুর খ্যাতি দেশজুড়ে। আর এ কারণেই জেলা ছাড়িয়ে পুরো বাংলাদেশে বিজয়নগর এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘লিচুর অঙ্গরাজ্য’ বা লিচুর রাজধানী হিসেবে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং সময়মতো সঠিক পরিচর্যার কারণে এ বছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন স্থানীয় চাষি ও কৃষি বিভাগ। ইতিমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে আগাম জাতের লিচু উঠতে শুরু করেছে এবং বাজারে ভালো দাম পেয়ে চাষিদের মুখে হাসির ঝিলিক দেখা গেছে।বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর ও পত্তন ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় প্রতিটি বাগানের গাছগুলো এখন লাল টকটকে লিচুতে ভরে আছে।
থোকায় থোকায় ঝুলছে রসালো এই ফল। স্থানীয় জাতের (পাতি লিচু) পাশাপাশি চায়না-থ্রি, বোম্বাই ও এলাচি জাতের লিচুর ফলনও এবার চমৎকার হয়েছে। স্থানীয় চাষিরা জানান, এ বছর ফলন আসার শুরুতে কিছুটা খরা থাকলেও পরবর্তী সময়ে আবহাওয়া লিচু চাষের উপযোগী ছিল। পোকার আক্রমণ কম হওয়ায় ফলের আকার ও মান বেশ ভালো হয়েছে।চম্পকনগর এলাকার একজন লিচু চাষি বলেন, এবার আমার বাগানের প্রায় প্রতিটি গাছেই প্রচুর লিচু এসেছে। ফলন যেমন ভালো, বাজারে দামও এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক। আশা করছি গত কয়েক বছরের লোকসান এবার পুষিয়ে নিতে পারব। আমাদের বিজয়নগরের মাটির গুণেই লিচু এত মিষ্টি হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে বাগানসহ কিনে নিয়ে যান। ‘লিচুর অঙ্গরাজ্য’ নামটা আমাদের জন্য গর্বের।ইতিমধ্যে উপজেলার চম্পকনগর, আওলিয়া বাজার ও মেরাশানীসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারগুলোতে লিচু কেনাবেচার ধুম পড়েছে। কাকডাকা ভোর থেকেই বাগান মালিক ও চাষিরা গাছ থেকে সদ্য পাড়া তাজা লিচু নিয়ে বাজারে হাজির হচ্ছেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে মুখরিত এখন পুরো এলাকা। ব্যবসায়ীরা জানান, বিজয়নগরের লিচু আকারে বেশ বড়, রসালো এবং এর আঁটি তুলনামূলকভাবে ছোট হয়। বাজারে বর্তমানে আকার ও জাতভেদে প্রতি হাজার লিচু ২,৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪,৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এখন সবচেয়ে বেশি আধিপত্য আগাম পেকে যাওয়া ‘পাতি লিচুর’।
তবে স্বাদে অনন্য বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের চাহিদাও আকাশচুম্বী।কৃষি বিভাগের মতে, প্রতি বছর এই অঞ্চলের লিচু বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। শুধু চাষিরাই নন, লিচু পাড়া, বাছাই করা, খাঁচা তৈরি এবং পরিবহনের সাথে যুক্ত হয়ে এই মৌসুমে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো মানুষের। তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও চাষিদের দাবি, বিজয়নগরে যদি একটি হিমাগার (Cold Storage) এবং সরকারি উদ্যোগে লিচুর প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা যেত, তবে চাষিরা পচনশীল এই ফলের আরও ন্যায্যমূল্য পেতেন এবং সংরক্ষণের সংকট চিরতরে দূর হতো।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, চলতি মরসুমে বিজয়নগরে লিচুর বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয় না ঘটলে এ বছর বিজয়নগর থেকে রেকর্ড পরিমাণ লিচু দেশজুড়ে সরবরাহ করা সম্ভব হবে এবং চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক লাভবান হবেন।