

আন্তর্জাতিক ডেস্ক.
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত-বাংলাদেশ অরক্ষিত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে এক বড় ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে নতুন বিজেপি সরকার। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ বুধবার বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছে প্রাথমিকভাবে ২৭ কিলোমিটার জমি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছেন।উল্লেখ্য, গত ৯ মে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করে।
এরপর ১১ মে অনুষ্ঠিত প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, অরক্ষিত সীমান্তকে সুরক্ষিত করতে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের হাতে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রাজ্যের ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্য সচিবকে। মুখ্যমন্ত্রীর সেই নির্দেশনার পর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আজ বুধবার জমি হস্তান্তরের প্রাথমিক ধাপটি সম্পন্ন হলো।এদিন রাজ্য সরকারের মূল প্রশাসনিক সচিবালয় ‘নবান্ন’-এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আজকের এই দিনটি অত্যন্ত অর্থবহ। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিএসএফের তরফ থেকে রাজ্যকে জানানো হয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ অরক্ষিত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি তুলে দিতে। কিন্তু বিগত সরকার সেই আবেদন অগ্রাহ্য করে কোনো সহযোগিতা করেনি। এর ফলে রাজ্য তথা সমগ্র দেশের সুরক্ষা এক বড়সড় সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। এই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই আমরা প্রথম দফায় ২৭ কিলোমিটার জমি বিএসএফের হাতে তুলে দিলাম।”সীমান্তের ভৌগোলিক সমীকরণ তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের ৪ হাজার কিলোমিটারের কিছু বেশি সীমান্ত রয়েছে, যার মধ্যে কেবল পশ্চিমবঙ্গের সাথেই রয়েছে ২২০০ কিলোমিটার। এই ২২০০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৬০০ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও আনুমানিক ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত এখনো অরক্ষিত।
আর ৫৫৫ কিলোমিটার এমন সীমান্ত এলাকা রয়েছে যেখানে রাজ্য সরকার চাইলেই জমি দিতে পারত, কিন্তু পূর্ববর্তী সরকার তা দেয়নি। এর জন্য যে নিয়মিত সীমান্ত সমন্বয় বৈঠক হওয়া প্রয়োজন ছিল, তাও করা হয়নি। আমরা সরকারে এসেই সেই সমন্বয় বৈঠক করেছি এবং এখন থেকে এটি প্রতিনিয়ত অনুষ্ঠিত হবে।সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিএসএফের ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) প্রবীণ কুমার রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে জানান, জমি পাওয়ার পর খুব শিগগিরই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের মূল কাজ শুরু হবে। বিশেষ করে সুন্দরবন জেলাসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নতুন সীমান্ত চৌকি (বিওপি) স্থাপন করা হবে। দেশের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি আরও জানান, বিএসএফ ইতিমধ্যেই চোরাকারবারিদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা রাজ্য সরকারের কাছে জমা দিয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন হলে সীমান্ত আরও নিশ্ছিদ্র হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।এদিন অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি অবৈধ অনুপ্রবেশ ইস্যুতেও চরম কঠোর বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “বিএসএফ-এর সঙ্গে সুদৃঢ় বন্ধন ও সমন্বয় তৈরি করে আমরা রাজ্য এবং দেশকে সুরক্ষিত করব। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ১৪ মে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য একটি নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আমাদের আগের সরকার একদিকে শরণার্থীদের সিএএ (সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন) এর আওতায় সুরক্ষা দেওয়ার বিরোধিতা করেছে, অন্যদিকে এই গুরুত্বপূর্ণ আইনকে কার্যকর করেনি। আজ থেকে আমরা এই আইন পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করলাম।”আইনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) অনুযায়ী নির্দিষ্ট সাতটি সম্প্রদায়ের মানুষ এই আইনের আওতায় নাগরিকত্বের সুবিধা পাবেন। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা এই ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে এ রাজ্যে এসেছেন, তাদের পুলিশ কোনো প্রকার হেনস্থা করতে পারবে না। কিন্তু যারা সিএএ-র শর্ত ও সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নন, তারা সম্পূর্ণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য হবেন।
তাদেরকে সরাসরি রাজ্য পুলিশ প্রথমে ডিটেক্ট (চিহ্নিত) ও আটক করবে, তারপর গ্রেফতার করে বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেবে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) সাথে ফ্ল্যাগ মিটিং ও আলোচনার মাধ্যমে পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ সরকার স্পষ্ট নীতিতে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’ প্রক্রিয়ায় হাঁটবে। রাজ্যের ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আজ থেকেই এই আইন কার্যকর করতে রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং মুখ্যসচিবকে প্রয়োজনীয় ও কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।