

আমাদের সমাজব্যবস্থায় বিয়ের পর বাসর রাতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের লোকজ ধারণা, উপদেশ ও কুসংস্কারের প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে নতুন কনেকে বিদায়ের প্রাক্কালে পরিবারের প্রবীণ নারী সদস্যরা নানা ধরনের "পরামর্শ" দিয়ে থাকেন, যার সিংহভাগই কেবল সামাজিক রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে আধুনিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্ত সনাতন ধারণার সবটুকু বাস্তবসম্মত নয় এবং তা অনেক সময় নববধূর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না।প্রচলিত সামাজিক নিয়মে অনেক মেয়েকে এই মর্মে দীক্ষা দেওয়া হয় যে, স্বামীর সম্মুখে সর্বদা নিভৃত ও মৌন থাকতে হবে, নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না এবং প্রথম দিনেই সমস্ত পরিস্থিতির সাথে আপস করে নিতে হবে। অনেক পরিবারে কনেকে অতিরিক্ত জড়তা ও লজ্জাবনত আচরণ প্রদর্শনের তাগিদ দেওয়া হয়, যা প্রকারান্তরে বাসর রাতকে ঘিরে এক প্রকার অমূলক ভীতি ও মানসিক চাপের জন্ম দেয়। অথচ মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নতুন একটি দাম্পত্য জীবন সুচারুভাবে শুরু করার জন্য পারস্পরিক অন্তর্দৃষ্টি ও মানসিক স্বস্তি সবচেয়ে জরুরি উপাদান। তাঁরা স্পষ্ট করেছেন যে, বাসর রাত কোনো পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয় এবং এটি নিয়ে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা লালন করাও অনুচিত। বিয়ের দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতার ধকল শেষে নতুন দম্পতি শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিশ্রান্ত থাকতে পারেন; তাই অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে এবং ধীরগতিতে বন্ধন সুদৃঢ় হওয়াই সম্পর্কের জন্য কল্যাণকর।বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একটি আদর্শ দাম্পত্য সম্পর্কের মূল স্তম্ভ হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং খোলামেলা কথোপকথন। কেবল সামাজিক অনুশাসন কিংবা প্রাচীন ধ্যানধারণার বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু জোরপূর্বক চাপিয়ে দিলে তা পরবর্তী সময়ে সম্পর্কের মধুরতা নষ্ট করতে পারে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও জীবনসঙ্গীর এই সম্পর্ককে স্নেহ, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে তোলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কোনো পক্ষকে মানসিক অস্বস্তিতে ফেলা কিংবা জোরজুলুম করাকে কখনোই সমর্থন করা হয় না। বর্তমান সচেতন মহলের মতে, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাসর রাত নিয়ে তৈরি হওয়া এই সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা ও লোকসংস্কার থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা জরুরি। নতুন জীবনের সূচনা যেন কোনো ভয় বা সংকোচের মধ্য দিয়ে না হয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও আন্তরিক পরিবেশে সম্পন্ন হয়, পরিবারের পক্ষ থেকে সেটিই নিশ্চিত করা উচিত।