

নিজস্ব প্রতিবেদক:দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি চরম ক্ষোভ ও গভীর আক্ষেপ উগরে দিয়ে নির্মমভাবে খুন হওয়া আট বছরের শিশু রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বলেছেন, “আমি কিছুই চাই না। কারণ বিচার আপনারা করতে পারবেন না। আপনাদের এই ধরনের কোনো রেকর্ড নাই। আপনারা পারবেন না।” গত বুধবার (২০ মে) সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি এসব কথা বলেন।
নিহত শিশু রামিসা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। তার বাবা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে কর্মরত এবং এই পরিবারটি প্রায় ১৭ বছর ধরে ঢাকার পল্লবী এলাকায় বসবাস করে আসছে। একমাত্র কন্যাসন্তানকে হারিয়ে আহাজারি করতে থাকা এই বাবার বুকফাটা আর্তনাদের কিছু ভিডিও ও বক্তব্য ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।সন্তানহারা পিতা হান্নান মোল্লা আরও বলেন, “আমার মেয়ে তো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। আপনারা কি এর সঠিক বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। আপনারা কোনো দৃষ্টান্ত বা এক্সাম্পল দাঁড় করাতে পারবেন? পারবেন না। আমার থেকে স্ট্যাম্পে লিখিত নেবেন? আপনারা আসলেই পারবেন না। এই ঘটনা বড়জোর আর ১৫ দিন আলোচনায় থাকবে। তারপর দেশে আরেকটা বড় কোনো ঘটনা আসবে এবং এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে। এভাবেই শেষ হয়ে যাবে সব, আমি দেখতেছি। আমার বয়স এখন ৫৫ বছর, আপনারা কি অতীতে এমন কোনো দৃষ্টান্তমূলক বিচারের এক্সাম্পল দিতে পারবেন? দেখাতে পারবেন?”এর আগে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটের শয়নকক্ষের খাটের নিচ থেকে শিশু রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরবর্তীতে বাথরুম থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এই লোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনার পর পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে। বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলাকেটে হত্যার অভিযোগে দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ঘাতক সোহেল রানা।আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ঘাতক সোহেল জানায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা নিজের ঘর থেকে বাইরে বের হলে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে জোরপূর্বক নিজেদের রুমের ভেতরে ডেকে নিয়ে যায়।
এরপর বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করে সোহেল। এতে যন্ত্রণায় জ্ঞান হারায় ছোট্ট রামিসা। ঠিক ওই মুহূর্তেই রামিসার মা নিখোঁজ মেয়ের খোঁজে সোহেলের বাসার দরজায় এসে কড়া নাড়তে থাকেন। বাইরে মায়ের আওয়াজ পেয়ে ভেতরে জানোয়ারের রূপ নেয় সোহেল এবং ঘটনা ধামাচাপা দিতে রামিসাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলাকেটে হত্যা করে। পরবর্তীতে মরদেহ সম্পূর্ণ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে মাথা কেটে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলে। এমনকি দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে এনে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে এবং ছুরি দিয়ে যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। এই পুরো নৃশংস ঘটনার সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার একই রুমে উপস্থিত ছিল। একপর্যায়ে জানালার গ্রিল কেটে তারা পালিয়ে যায়। ঘাতক আরও স্বীকার করেছে, এই অপরাধ সংগঠনের আগে সে অতিমাত্রায় ইয়াবা সেবন করেছিল, তবে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না।ভয়াবহ এই ঘটনার পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার রাতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামের মোল্লাবাড়িতে নিজস্ব পারিবারিক কবরস্থানে শিশু রামিসার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পুরো গ্রামে এখন শুধুই শোকের মাতম।