

মোঃশেখ ফরিদ, স্টাফ রিপোর্টার: পঞ্চগড়ে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে প্রসূতি সেবার নামে চরম অবহেলা ও অনভিজ্ঞ নার্সদের দিয়ে জোরপূর্বক ভুল চিকিৎসার কারণে এক নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গত রবিবার (৭ জুন ২০২৬) রাতে জেলা শহরের ‘আদর্শ ক্লিনিক’ নামক একটি লাইসেন্সবিহীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই ঘটনা ঘটে। তবে সৌভাগ্যবশত প্রসূতি মা বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন।এই অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্লিনিক জুড়ে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। নবজাতকের স্বজনদের অভিযোগ, সিজারিয়ান (সিজার) অপারেশনের জন্য প্রসূতিকে ভর্তি করা হলেও কোনো ওটি সার্জন বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি ছাড়াই ক্লিনিকের দুই অনভিজ্ঞ নার্স দিয়ে স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) চেষ্টা করা হয়।
এতে চিকিৎসাগত মারাত্মক অবহেলার কারণেই গর্ভেই বাচ্চার দম আটকে মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয়রা ক্লিনিকে গিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাদের আরও অভিযোগ, নবজাতকের মৃত্যুর নির্মম সত্য আড়াল করতে দীর্ঘ সময় মরদেহ আটকে রেখেছিল ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। পরে গভীর রাতে পুলিশ ও স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।মৃত নবজাতকের মা পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মিতু (১৯), তিনি স্থানীয় মনিরুল ইসলামের স্ত্রী।স্বজন ও ক্লিনিক সূত্রে জানা যায়, রবিবার বিকেলে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নির্ণয়ের পর মিতুকে সিজারিয়ান অপারেশনের চুক্তি সাপেক্ষে আদর্শ ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কোনো সার্জন উপস্থিত না থাকায় দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করা হয়। একপর্যায়ে বাইরে থাকা চিকিৎসক ডা. আফিয়া জান্নাত আফির সঙ্গে ফোনে কথা বলে তাঁর পরামর্শে ক্লিনিকের দুই নার্স—সারজিনা ও আখি—প্রসূতির জীবন ঝুঁকিতে ফেলে জোরপূর্বক নরমাল ডেলিভারি করানোর চেষ্টা করেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মৃত নবজাতক প্রসব হয়েছে বলে স্বজনদের জানানো হলে পরিবারে কান্নার রোল পড়ে এবং তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।ভুক্তভোগী মিতুর মা রূপালি বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার মেয়েকে সিজারের জন্য ক্লিনিকে টাকা জমা দিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু বিকেল থেকে ডাক্তার আসবে আসবে বলে সময় নষ্ট করা হয়। রাতে আমাদের কোনো অনুমতি না জানিয়ে ওই দুই নার্স জোর করে নরমাল ডেলিভারি করানোর চেষ্টা করে। তাদের এই হাতুড়ে চিকিৎসা ও অবহেলার কারণেই আমার ফুটফুটে নাতিটা দুনিয়ার আলো দেখার আগেই মারা গেল। আমরা এই কসাইদের কঠিন বিচার চাই, থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছি।”অভিযুক্ত নার্স আখি নিজের দোষ আংশিক স্বীকার করে বলেন, “ডা. আফিয়া জান্নাত ম্যামের ফোন কল ও পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে প্রসব বেদনা বাড়ানোর স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। প্রসবের শেষ মুহূর্তে শিশুটি জরায়ুর মুখে দীর্ঘ সময় আটকে ছিল, মূলত তখনই দম আটকে তার মৃত্যু হয়। তবে স্বীকার করছি, নরমাল ডেলিভারির সময় কোনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসক আমাদের পাশে বা ক্লিনিকে উপস্থিত ছিলেন না।”এদিকে আদর্শ ক্লিনিকের ম্যানেজার মোজাহারুল ইসলাম মাসুদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “প্রসবের সময় ক্লিনিকে কোনো অন-ডিউটি চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। তবে ডা. আফিয়া জান্নাত ফোনে স্যালাইন ও ইনজেকশন পুশ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।” তিনি আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, ক্লিনিকটির প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স বর্তমানে হালনাগাদ (রিনিউ) নেই এবং আইন অমান্য করে সেখানে সার্বক্ষণিক কোনো কোয়ালিফাইড চিকিৎসকও রাখা হয়নি।এ বিষয়ে পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান বলেন, “নবজাতকের এই দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনায় এখনো ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ আমরা পাইনি। তবে গণমাধ্যমের মারফতে বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। লাইসেন্সবিহীন ও ডাক্তার ছাড়া ক্লিনিক চলার কোনো নিয়ম নেই, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”এই ঘটনার পর জেলা শহর জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই অবৈধ ক্লিনিকটি সিলগালা করাসহ দায়ী নার্স ও ম্যানেজারের বিরুদ্ধে দ্রুত ফৌজদারি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।