

রংপুর প্রতিনিধি
উজানের পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে কিছুদিন বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলেও এখন ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে তিস্তা নদীতে। কিন্তু পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষের জন্য এই ভাঙন যেন আরও বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা গ্রামটি এখন তিস্তার ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। গত এক সপ্তাহে প্রায় ১০ একর আবাদি জমি তিস্তার গর্ভে হারিয়ে গেছে। জমির সঙ্গে বিলীন হয়েছে বছরের একমাত্র ধান আবাদ। কৃষক পরিবারের ওপর নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।
স্থানীয় কৃষক মোস্তফা জানান, “আমাদের পুরো জীবিকা নির্ভর করে এই জমির ওপর। গত সপ্তাহেই দেখি ধানক্ষেত ধীরে ধীরে ভেঙে নদীতে চলে যাচ্ছে। চোখের সামনে নিজের ফসল নদীতে বিলীন হতে দেখা খুব কষ্টের।” আইয়ুব আলী বলেন, “আমাদের গ্রামে অন্তত পঞ্চাশটি পরিবার এখন ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ভাঙন থামানো না গেলে ঘরবাড়ি পর্যন্ত নদীতে চলে যাবে।”
অতুল চন্দ্র জানান, “আমরা বছরে একবারই আমন ধান আবাদ করতে পারি। সেটিই যদি নদী কেড়ে নেয়, তবে পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে বাঁচব?” ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুধু জমিই নয়, অনেকের বসতভিটাও ঝুঁকির মুখে। ভাঙনের কারণে বহু পরিবার ইতিমধ্যেই ঘরবাড়ি সরাতে বাধ্য হয়েছে। গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে নতুন আশ্রয় খোঁজা তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মকবুল হোসেন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “প্রতিবারই আমরা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হই। কিন্তু এবার ক্ষতির মাত্রা আরও বেশি। ফসল নেই, ঘর নেই—সরকারি সহযোগিতা ছাড়া বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।” কোলকোন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (প্যানেল) চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম জানান, এ ভাঙন নতুন নয়, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষ এই দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা বহুবার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছি যে বিনবিনা থেকে চর শংকরদহ পর্যন্ত একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ জরুরি। কিন্তু তারা শুধু আশ্বাস দেয়, বাস্তবে কোনো উদ্যোগ নেয় না।”
তার মতে, যদি দ্রুত কার্যকর বাঁধ নির্মাণ করা যায়, তবে কোলকোন্দ ইউনিয়ন ছাড়াও পার্শ্ববর্তী লক্ষীটারী ইউনিয়নের বহু মানুষ ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে। গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, নদীভাঙনের পরিস্থিতি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর রাখছি। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি মানুষকে নিরাপদে রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।”
তিস্তা নদী প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নতুন করে ভাঙন সৃষ্টি করে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় প্রতি বছর নতুন নতুন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক গবেষণা অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার হাজার হাজার পরিবার তিস্তার ভাঙনে ভূমিহীন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে জিও ব্যাগ ফেলা বা অস্থায়ী মেরামত কাজ করা হলেও সেটি কার্যকর হয় না। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি বহু বছরের হলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তার ভাঙন নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। যদি দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে শুধু কৃষিজমি নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও সামাজিক অবকাঠামোও হুমকির মুখে পড়বে। অতুল চন্দ্রের কথাতেই ভাঙনের ভয়াবহতা স্পষ্ট—“আমাদের জীবিকা তো নদী নিয়ে গেল, কিন্তু আগামী দিনে সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।”